🇮🇳সুন্দরবন ভ্রমণ – ২🇮🇳

0
27

নীরেশ দেবনাথ✍️

ভারতবর্ষের বেশিরভাগ রিজার্ভ ফরেস্ট, ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি, পাখিরালয় কমবেশি প্রায় একই রকম দেখতে। বড় বড় গাছ, তৃণভূমি, ছোট বড় টিলা, পাহাড়ি ছোট নদী থাকে। সাথে থাকে একটা লাইফ স্যাংচুয়ারি। অর্থাৎ বলতে চাইছি একটা অভয়ারণ্যের সাথে অন্য অভয়ারণ্যের খুব বেশি পার্থক্য থাকে না। কিন্তু এই সুন্দরবন তাদের সকলের চেয়ে আলাদা। অনন্যা। এখানে তৃণভূমি নেই। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার কোনো উপায়ও নেই। চতুর্দিকে খাল আর খাল, জল আর জল, নদী আর নদী। শুধু জলবিহার। ওয়াটার সাফারি। শুধু লঞ্চে করে যাতায়াত করা, নেমে কিছু দেখা যাবে না। বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া লঞ্চ থেকে কেউ ডাঙ্গায় নামতে পারবে না।

তা নামতে না পারলেও লঞ্চে থেকে নদী বা খালের দু ধরে নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে খুশি হবে না এমন মানুষ বোধহয় কোথাও পাওয়া যাবে না। আমাদের লঞ্চের সকলেই খুব উৎসাহের সঙ্গেই গল্প ক’রে, গান গেয়ে, কবিতা আবৃত্তি করে মহা আনন্দের সঙ্গে হৈ চৈ করে কাটিয়ে দিয়েছিলাম। একজন বাচিক শিল্পী ছিলেন। উনি আমার কয়েকটা কবিতা আবৃত্তি করলেন। সকলের খুব ভালো লাগলো। এইভাবে কোথা দিয়ে যে সময় কেটে গেলো টেরই পেলাম না।

দোবাঁকিতে আধ কিলোমিটার লম্বা একটা skywalk দিয়ে হেঁটে গিয়ে একটা টাওয়ার। তার মাথায় উঠে চতুর্দিকে মনোরম দৃশ্য দেখা গেলো। Forest Department-এর nursery-তে ম্যানগ্রোভ জাতীয় অসংখ্য চারা উৎপন্ন করে রেখেছে। গাইড জানালো এগুলি সবই গরান ও গেওয়া জাতীয় উদ্ভিদের চরা। কিন্তু যে সুন্দরী গাছের নামের সাথে সুন্দরবন নাম যুক্ত সেই সুন্দরী গাছের চারা উৎপাদনে তেমন উদ্যোগ দেখলাম না।

এখানে skywatk থেকে নেমে ফেরি ঘাটের দিকে যেতে যেতে একটা ছোট পুকুর দেখলাম। এই পুকুরের জল মিষ্টি জল। তার চারপাশে আমাদের গ্রাম বাংলার যে সমস্ত গাছ-গাছালি, ফুল গাছ ইত্যাদি থাকে তার মধ্যে বেশ কিছু গাছ দেখতে পেলাম। আম গাছ, পেয়ারা গাছ, কলা গাছ, জবা ফুল, মরসুমী ফুল গাছ দেখতে পেলাম। পুকুরের একপাশে ফরেস্ট গার্ডদের থাকার জন্য কোয়াটার বানানো আছে। এই গাছ-গাছালি গুলি ফরেস্ট গার্ডরাই পরিচর্যা করে বড় করেছে। এই পুকুরে দু-তিন জনকে স্নান করতে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করায় বলল, হ্যাঁ, এই জলটা মিষ্টি জল। এটার পার একটু উচু করে বানানো থাকাতে সমুদ্রের লোনাজল প্রবেশ করতে পারে না। হরেক রকম ফুল ও ফলের গাছ দেখা গেলো এখানে।

এখন থেকে ফেরিঘাটে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের লঞ্চ দুটো লঞ্চের পরে এসে ঘাটে ভিড়ল। আমরা সকলে আস্তে আস্তে উঠে পড়লাম। তারপর এখান থেকে লঞ্চ আবার জঙ্গলের ভেতর দিকে খাল বেয়ে এগিয়ে গেল। সুন্দর সুন্দর গাছ-গাছালি, অবশ্য সবই প্রায় একই ধরনের। এগিয়ে চললাম আর গাইডের মুখে বনবিবির কাহিনী মন দিয়ে শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে গেলাম।

তারপর ফেরার পালা। আমরা এই লঞ্চের ১৪ জনের আজকেই ভ্রমন শেষ। পাখিরালা পৌঁছে সেখান থেকে আমাদের ক্যানিং যাওয়ার পথ ধরবো।

দেখতে দেখতে পাখিরালা ঘাটে এসে আমাদের লঞ্চ ভিড়ল। আমরা যে ১৪ জনের ভ্রমণ আজকে শেষ হলো – তারা নেমে এলাম। অবশ্য অন্য সকলেও নেমে এলো। তারা হোটেলের দিকে ধীরে ধীরে প্রবেশ করলো। আর আমরা অটোরিকশা ধরলাম। আমরা ১৪ জন এবং ট্রাভেল এজেন্সির দুজন লোক – মোট ১৬ জন দুটো অটোরিকশা করে পাখীরালা থেকে যাত্রা করে গোসাবা ফেরি ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। পাখিরালা থেকে গোসাবা ফেরিঘাট মাত্র ৭ কিলোমিটার রাস্তা। গ্রামের রাস্তা – কিন্তু খুব সুন্দর। রাস্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আমরা এসে গোসোবা বাজার পার হয়ে ফেরিঘাটের কাছে নামলাম। তারপর স্পিডবোটে উঠলাম, সেখান থেকে নদী পার হয়ে গদখালি পৌঁছুলাম।

গদখালী থেকে আবারও দুটো অটোরিক্সাতে আমরা এই ১৬ জন ক্যানিংএর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। প্রায় এক ঘন্টা কুড়ি মিনিটের রাস্তা। ক্যানিং স্টেশনে এসে সঙ্গে সঙ্গে টিকিট কেটে ট্রেনে এসে বসলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য। শেষ হলো আমাদের সুন্দরবন ভ্রমন। মনটা ভরে নিয়ে এলাম সুন্দরবনের স্মৃতি।

অগুনতি নদী, খাল, দু পাশের বাদা, আবাদা এসবের নাম গাইড বলে গেছে কিন্তু কিছুই প্রায় মনে নেই। তা না-ই বা রইলো মনে সেসব নাম। কি-ই বা হলো তাতে! মনের ভিতরে ছবির মত সাজানো রয়ে গেলো যে সুন্দরবনের মধু মাখা স্মৃতিটুকু! এই স্মৃতিটুকু থেকেই যাবে আমার বুকের ভিতরে! চোখ বুঁজলে যে দেখতে পাই সবই পর পর! মন দিক না যতই ধোঁকা, কিছু নাও যদি মনে থাকে – বুকের অন্তরের স্মৃতিগুলো কিছুতেই কেড়ে নিতে পারবে না। এই স্মৃতিগুলো থেকেই যাবে অন্তরের একেবারে গভীরে। এইটাকেই বলে ভালো লাগা। এই ভালো লাগাটাই অক্ষয় হয়ে থাকে।সুন্দরবন ভ্রমণের এই ভালো লাগাটাই আমি রেখে দিলাম সযত্নে বুকের ভিতরে।

রচনাকাল –
09 মার্চ, 2022
পনিহাটি।