🇮🇳 হে নূতন 🇮🇳

0
9


বিশ্বেশ্বর মহাপাত্র✍️
পশ্চিম মাশুড়িয়া,পূর্ব মেদিনীপুর ৭২১৪৫৮

আবার বছরান্তে এসেছে এক নতুন রবি কিরণে
পঁচিশে বৈশাখ।
এই কবি প্রনামে আসুন গঙ্গা জলে সেই গঙ্গার পূজা করি আমাদের প্রানের দেবতার। যে পূজার প্রচলন করে বিশ্বকবি বন্দীলেন তার-ই কালে কালে সৃষ্ট স্রোতসিনী সৃষ্টির বন্দনা আপন কবিতায় –
“পঁচিশে বৈশাখ “
রাত্রি হল ভোর।
আজি মোর
জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,
প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি
হাতে করে আনি
দ্বারে আসি দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।

        দিগন্তে আরক্ত রবি;

অরণ্যের ম্লান ছায়া বাজে যেন বিষণ্ন ভৈরবী।
শাল-তাল-শিরীষের মিলিত মর্মরে
বনান্তের ধ্যান ভঙ্গ করে।
রক্তপথ শুষ্ক মাঠে,
যেন তিলকের রেখা সন্ন্যাসীর উদার ললাটে।

     এই দিন বৎসরে বৎসরে

নানা বেশে ফিরে আসে ধরণীর ‘পরে—
আতাম্র আম্রের বনে ক্ষণে ক্ষণে সাড়া দিয়ে,
তরুণ তালের গুচ্ছে নাড়া দিয়ে,
মধ্যদিনে অকস্মাৎ শুষ্কপত্রে তাড়া দিয়ে,
কখনো বা আপনারে ছাড়া দিয়ে
কালবৈশাখীর মত্ত মেঘে
বন্ধহীন বেগে।
আর সে একান্তে আসে
মোর পাশে
পীত উত্তরীয়তলে লয়ে মোর প্রাণদেবতার
স্বহস্তে সজ্জিত উপহার—
নীলকান্ত আকাশের থালা,
তারি ‘পরে ভুবনের উচ্ছলিত সুধার পিয়ালা।

রবীন্দ্র রচনাবলীর পরতে পরতে আপ্ত স্মৃতিমেদুর আনন্দ বিষাদের সৃজনশীল আত্ম বিভোর বয়ঃবৃদ্ধ রবীন্দ্র উদ্ভাসিত হলেন আপন কবিতায় চরণের বয়ানে,তারই ভাস্বর রূপ জীবন মুকুরে প্রতিভাত কিংবা ক‍্যানভাসে আঁকা ছবির মতোই-
তাই কবি লিখলেন তার
‘নবজাতক’ কাব্যগ্রন্থে “জন্মদিন”কবিতায়-

জন্মদিন

          তোমরা রচিলে যারে
               নানা অলংকারে
           তারে তো চিনি নে আমি,
               চেনেন না মোর অন্তর্যামী

তোমাদের স্বাক্ষরিত সেই মোর নামের প্রতিমা।
বিধাতার সৃষ্টিসীমা
তোমাদের দৃষ্টির বাহিরে।
কালসমুদ্রের তীরে
বিরলে রচেন মূর্তিখানি
বিচিত্রিত রহস্যের যবনিকা টানি
রূপকার আপন নিভৃতে।
বাহির হইতে
মিলায়ে আলোক অন্ধকার
কেহ এক দেখে তারে, কেহ দেখে আর।
খণ্ড খণ্ড রূপ আর ছায়া,
আর কল্পনার মায়া,
আর মাঝে মাঝে শূন্য, এই নিয়ে পরিচয় গাঁথে
অপরিচয়ের ভূমিকাতে।
সংসারখেলার কক্ষে তাঁর
যে-খেলেনা রচিলেন মূর্তিকার
মোরে লয়ে মাটিতে আলোতে,
সাদায় কালোতে,
কে না জানে সে ক্ষণভঙ্গুর
কালের চাকার নিচে নিঃশেষে ভাঙিয়া হবে চুর।
সে বহিয়া এনেছে যে-দান
সে করে ক্ষণেকতরে অমরের ভান–
সহসা মুহূর্তে দেয় ফাঁকি,
মুঠি-কয় ধূলি রয় বাকি,
আর থাকে কালরাত্রি সব-চিহ্ন-ধুয়ে-মুছে-ফেলা।
তোমাদের জনতার খেলা
রচিল যে পুতুলিরে
সে কি লুব্ধ বিরাট ধূলিরে
এড়ায়ে আলোতে নিত্য রবে।
এ কথা কল্পনা কর যবে
তখন আমার
আপন গোপন রূপকার
হাসেন কি আঁখিকোণে,
সে কথাই ভাবি আজ মনে।

(১৩৪৬ সনের পঁচিশে বৈশাখ পুরিতে বসে)

মানব ঠাকুর রবি ঠাকুর যে পাঠক মননের মন মন্দিরের দেবতা হিসেবে পূজিত তা বিলক্ষন জানতেন বলেই তার এই কবিতার অবতারণা –

জীবনের প্রতিটি জন্মদিন কি অনিবার্য ভাবে যেন রবীন্দ্রনাথ কে অনির্বচনীয় জীবনী শক্তিতে উজ্জ্বিবীত করে আরও প্রানবন্ত করে।তাইতো তিনি লিখতে পারেন

‘সেঁজুতি’ কাব্যগ্রন্থে

“জন্মদিন” কবিতায়

দৃষ্টিজালে জড়ায় ওকে হাজারখানা চোখ,
ধ্বনির ঝড়ে বিপন্ন ওই লোক।
জন্মদিনের মুখর তিথি যারা ভুলেই থাকে,
দোহাই ওগো, তাদের দলে লও এ মানুষটাকে–
সজনে পাতার মতো যাদের হালকা পরিচয়,
দুলুক খসুক শব্দ নাহি হয়।
সবার মাঝে পৃথক ও যে ভিড়ের কারাগারে
খ্যাতি-বেড়ির নিরন্ত ঝংকারে।
সবাই মিলে নানা রঙে রঙিন করছে ওরে,
নিলাজ মঞ্চে রাখছে তুলে ধরে,
আঙুল তুলে দেখাচ্ছে দিনরাত;
কোথায় লুকোয় ভেবে না পায়, আড়াল ভূমিসাৎ।
দাও-না ছেড়ে ওকে
স্নিগ্ধ -আলো শ্যামল-ছায়া বিরল-কথার লোকে,
বেড়াহীন বিরাট ধূলি-‘পর,
সেই যেখানে মহাশিশুর আদিম খেলাঘর।
ভোরবেলাকার পাখির ডাকে প্রথম খেয়া এসে
ঠেকল যখন সব-প্রথমের চেনাশোনার দেশে,
নামল ঘাটে যখন তারে সাজ রাখে নি ঢেকে,
ছুটির আলো নগ্ন গায়ে লাগল আকাশ থেকে–
যেমন করে লাগে তরীর পালে,
যেমন লাগে অশোক গাছের কচি পাতার ডালে।
নাম ভোলা ফুল ফুটল ঘাসে ঘাসে
সেই প্রভাতের সহজ অবকাশে।
ছুটির যজ্ঞে পুষ্পহোমে জাগল বকুলশাখা,
ছুটির শূন্যে ফাগুনবেলা মেলল সোনার পাখা।
ছুটির কোণে গোপনে তার নাম
আচম্‌কা সেই পেয়েছিল মিষ্টিসুরের দাম;
কানে কানে সে নাম ডাকার ব্যথা উদাস করে
চৈত্রদিনের স্তব্ধ দুইপ্রহরে।
আজ সবুজ এই বনের পাতায় আলোর ঝিকিঝিকি
সেই নিমেষের তারিখ দিল লিখি।
তাহারে ডাক দিয়েছিল পদ্মানদীর ধারা,
কাঁপন-লাগা বেণুর শিরে দেখেছে শুকতারা;
কাজল-কালো মেঘের পুঞ্জ সজল সমীরণে
নীল ছায়াটি বিছিয়েছিল তটের বনে বনে;
ও দেখেছে গ্রামের বাঁকা বাটে
কাঁখে কলস মুখর মেয়ে চলে স্নানের ঘাটে;

      সর্ষেতিসির খেতে

দুইরঙা সুর মিলেছিল অবাক আকাশেতে;
তাই দেখেছে চেয়ে চেয়ে অস্তরবির রাগে–
বলেছিল, এই তো ভালো লাগে।
সেই-যে ভালো-লাগাটি তার যাক সে রেখে পিছে,
কীর্তি যা সে গেঁথেছিল হয় যদি হোক মিছে,
না যদি রয় নাই রহিল নাম–
এই মাটিতে রইল তাহার বিস্মিত প্রণাম।

আলমোড়ায় থেকে, ২২ বৈশাখ, ১৩৪৪ সনে এই কবিতা লিখেছেন।
যে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকে শিলং পাহাড়ের চূড়ায় বসে জিজ্ঞাসা করেছিলেন “কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও আর দেখেছিলেন তার রথকে নিত‍্য উধাহ হতে।সেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন আপন জন্মদিনে

‘স্ফুলিঙ্গ’ কাব্যগ্রন্থের কবিতায়

জন্মদিন আসে বারে বারে
মনে করাবারে–
এ জীবন নিত্যই নূতন
প্রতি প্রাতে আলোকিত
পুলকিত
দিনের মতন।

প্রতি প্রাতের প্রকৃতিক রবির মতোই বিশ্বমাটির ধূলায় থাকতে চাওয়া এই রবির প্রতিটা জন্মদিনেও এক নতুন আশায় পুলকিত করে তারই অনুরণন অনুরণিত হতে দেখি কবিতায় কবিতায়।

‘শেষ লেখা’ – কাব্যগ্রন্থে তাই কবি লিখতে পারলেন-

আমার এ জন্মদিন-মাঝে আমি হারা
আমি চাহি বন্ধুজন যারা
তাহাদের হাতের পরশে
মর্ত্যের অন্তিম প্রীতিরসে
নিয়ে যাব জীবনের চরম প্রসাদ,
নিয়ে যাব মানুষের শেষ আশীর্বাদ।
শূন্য ঝুলি আজিকে আমার;
দিয়েছি উজাড় করি
যাহা-কিছু আছিল দিবার,
প্রতিদানে যদি কিছু পাই
কিছু স্নেহ, কিছু ক্ষমা
তবে তাহা সঙ্গে নিয়ে যাই
পারের খেয়ায় যাব যবে
ভাষাহীন শেষের উৎসবে।

শান্তিনিকেতনের উদয়নে বসে ৬ মে ১৯৪১ সনের সকালে কবি এই কবিতা রচনা করে জানিয়েছিল আপন জন্মদিনের ইপ্সিত আকাঙ্খা।

আবার

‘জন্মদিনে’ কাব্যগ্রন্থের কবিতার কোলাজের মধ‍্যে থেকেই লিখেছেন –

সেদিন আমার জন্মদিন।
প্রভাতের প্রণাম লইয়া
উদয়দিগন্ত-পানে মেলিলাম আঁখি,
দেখিলাম সদ্যস্নাত উষা
আঁকি দিল আলোকচন্দনলেখা
হিমাদ্রির হিমশুভ্র পেলব ললাটে।
যে মহাদূরত্ব আছে নিখিল বিশ্বের মর্মস্থানে
তারি আজ দেখিনু প্রতিমা
গিরীন্দ্রের সিংহাসন-‘পরে।
পরম গাম্ভীর্যে যুগে যুগে
ছায়াঘন অজানারে করিছে পালন
পথহীন মহারণ্য-মাঝে,
অভ্রভেদী সুদূরকে রেখেছে বেষ্টিয়া
দুর্ভেদ্য দুর্গমতলে
উদয়-অস্তের চক্রপথে।
আজি এই জন্মদিনে
দূরত্বের অনুভব অন্তরে নিবিড় হয়ে এল।
যেমন সুদূর ওই নক্ষত্রের পথ
নীহারিকা-জ্যোতির্বাষ্প-মাঝে
রহস্যে আবৃত,
আমার দূরত্ব আমি দেখিলাম তেমনি দুর্গমে-
অলক্ষ্য পথের যাত্রী, অজানা তাহার পরিণাম।
আজি এই জন্মদিনে
দূরের পথিক সেই তাহারি শুনিনু পদক্ষেপ
নির্জন সমুদ্রতীর হতে।

(উদয়নের ছায়া সুনিবিড় ঘরে বসে নীলিমায় নীল আকাশে ভাসমান সাদা মেঘপুঞ্জের ক‍্যানভাস কে নবপ্রভাতের রবি যেমন দুর্গমতা ছাড়িয়ে রঞ্জিত করে মাটির এ রবি তেমন ভাষা সাহিত‍্যের দুর্গমতা কে লঙ্ঘন করা অভিপ্রায়ে ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১ – সকালে লিখলেন এই অনবদ‍্য কবিতা।

আরও একবার ব্রাহ্ম রীতি পালনকারি কবি ১৩৪৭ সালে তাঁর আশি বর্ষীয় জন্মদিন-র আগের দিন মংপুর শৈলবাসে বসে লিখলেন-

কাল প্রাতে মোর জন্মদিনে
এ শৈল-আতিথ্যবাসে
বুদ্ধের নেপালী ভক্ত এসেছিল মোর বার্তা শুনে।
ভূতলে আসন পাতি
বুদ্ধের বন্দনামন্ত্র শুনাইল আমার কল্যাণে–
গ্রহণ করিনু সেই বাণী।
এ ধারায় জন্ম নিয়ে যে মহামানব
সব মানবের জন্ম সার্থক করেছে একদিন,
মানুষের জন্মক্ষণ হতে
নারায়ণী এ ধরণী
যাঁর আবির্ভাব লাগি অপেক্ষা করেছে বহু যুগ,
যাঁহাতে প্রত্যক্ষ হল ধরায় সৃষ্টির অভিপ্রায়,
শুভক্ষণে পুণ্যমন্ত্রে
তাঁহারে স্মরণ করি জানিলাম মনে–
প্রবেশি মানবলোকে আশি বর্ষ আগে
এই মহাপুরুষের পুণ্যভাগী হয়েছি আমিও।

এখানে থেকে কবি তার জন্মদিনে পাহাড়ের পাহাড়ি শুভেচ্ছা শুভকামনার পূজায় বিহ্বলঘন হয়ে লিখলেন

অপরাহ্নে এসেছিল জন্মবাসরের আমন্ত্রণে
পাহাড়িয়া যত।
একে একে দিল মোরে পুষ্পের মঞ্জরি
নমস্কারসহ।
ধরণী লভিয়াছিল কোন্‌ ক্ষণে
প্রস্তর আসনে বসি
বহু যুগ বহ্নিতপ্ত তপস্যার পরে এই বর,
এ পুষ্পের দান,
মানুষের জন্মদিনে উৎসর্গ করিবে আশা করি।
সেই বর, মানুষেরে সুন্দরের সেই নমস্কার
আজি এল মোর হাতে
আমার জন্মের এই সার্থক স্মরণ।
নক্ষত্রে-খচিত মহাকাশে
কোথাও কি জ্যোতিঃসম্পদের মাঝে
কখনো দিয়েছে দেখা এ দুর্লভ আশ্চর্য সম্মান।

মহামতি মননশীল বিশ্ববরেণ‍্য কবি তার সেঁজুতি’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা কোলাজে রেখে গেলেন তাঁর আত্মদর্শি প্রজ্ঞায় –

কালিম্পং এর গৌরীপুর-ভবনে থাকা কালিক ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৫সালে জন্মদিন নিয়ে লিখলেন “জন্মদিন”

আজ মম জন্মদিন। সদ্যই প্রাণের প্রান্তপথে
ডুব দিয়ে উঠেছে সে বিলুপ্তির অন্ধকার হতে
মরণের ছাড়পত্র নিয়ে। মনে হতেছে কী জানি
পুরাতন বৎসরের গ্রন্থিবাঁধা জীর্ণ মালাখানি
সেথা গেছে ছিন্ন হয়ে; নবসূত্রে পড়ে আজি গাঁথা
নব জন্মদিন। জন্মোৎসবে এই-যে আসন পাতা
হেথা আমি যাত্রী শুধু, অপেক্ষা করিব, লব টিকা
মৃত্যুর দক্ষিণ হস্ত হতে, নূতন অরুণলিখা
যবে দিবে যাত্রার ইঙ্গিত।
আজ আসিয়াছে কাছে
জন্মদিন মৃত্যুদিন, একাসনে দোঁহে বসিয়াছে,
দুই আলো মুখোমুখি মিলিছে জীবনপ্রান্তে মম
রজনীর চন্দ্র আর প্রত্যুষের শুকতারাসম–
এক মন্ত্রে দোঁহে অভ্যর্থনা।
প্রাচীন অতীত, তুমি
নামাও তোমার অর্ঘ্য; অরূপ প্রাণের জন্মভূমি,
উদয়শিখরে তার দেখো আদিজ্যোতি। করো মোরে
আশীর্বাদ, মিলাইয়া যাক তৃষাতপ্ত দিগন্তরে
মায়াবিনী মরীচিকা। ভরেছিনু আসক্তির ডালি
কাঙালের মতো; অশুচি সঞ্চয়পাত্র করো খালি,
ভিক্ষামুষ্টি ধূলায় ফিরায়ে লও, যাত্রাতরী বেয়ে
পিছু ফিরে আর্ত চক্ষে যেন নাহি দেখি চেয়ে চেয়ে
জীবনভোজের শেষ উচ্ছিষ্টের পানে।
হে বসুধা,
নিত্য নিত্য বুঝায়ে দিতেছ মোরে– যে তৃষ্ণা, যে ক্ষুধা
তোমার সংসাররথে সহস্রের সাথে বাঁধি মোরে
টানায়েছে রাত্রিদিন স্থুল সূক্ষ্ম নানাবিধ ডোরে
নানা দিকে নানা পথে, আজ তার অর্থ গেল কমে
ছুটির গোধূলিবেলা তন্দ্রালু আলোকে। তাই ক্রমে
ফিরায়ে নিতেছ শক্তি, হে কৃপণা, চক্ষুকর্ণ থেকে
আড়াল করিছ স্বচ্ছ আলো; দিনে দিনে টানিছে কে
নিষ্প্রভ নেপথ্যপানে। আমাতে তোমার প্রায়োজন
শিথিল হয়েছে, তাই মূল্য মোর করিছ হরণ,
দিতেছ ললাটপটে বর্জনের ছাপ। কিন্তু জানি,
তোমার অবজ্ঞা মোরে পারে না ফেলিতে দূরে টানি।
তব প্রয়োজন হতে অতিরিক্ত যে মানুষ তারে
দিতে হবে চরম সম্মান তব শেষ নমস্কারে।
যদি মোরে পঙ্গু কর, যদি মোরে কর অন্ধপ্রায়,
যদি বা প্রচ্ছন্ন কর নিঃশক্তির প্রদোষচ্ছায়ায়,
বাঁধ বার্ধক্যের জালে, তবু ভাঙা মন্দিরবেদীতে
প্রতিমা অক্ষুণ্ন রবে সগৌরবে; তারে কেড়ে নিতে
শক্তি নাই তব।
ভাঙো ভাঙো, উচ্চ করো ভগ্নস্তূপ,
জীর্ণতার অন্তরালে জানি মোর আনন্দস্বরূপ
রয়েছে উজ্জ্বল হয়ে। সুধা তারে দিয়েছিল আনি
প্রতিদিন চতুর্দিকে রসপূর্ণ আকাশের বাণী;
প্রত্যুত্তরে নানা ছন্দে গেয়েছে সে “ভালোবাসিয়াছি’।
সেই ভালোবাসা মোরে তুলেছে স্বর্গের কাছাকাছি
ছাড়ায়ে তোমার অধিকার। আমার সে ভালোবাসা

সব ক্ষয়ক্ষতিশেষে অবশিষ্ট রবে; তার ভাষা
হয়তো হারাবে দীপ্তি অভ্যাসের ম্লানস্পর্শ লেগে,
তবু সে অমৃতরূপ সঙ্গে রবে যদি উঠি জেগে
মৃত্যুপরপারে। তারি অঙ্গে এঁকেছিল পত্রলিখা
আম্রমঞ্জরীর রেণু, এঁকেছে পেলব শেফালিকা
সুগন্ধি শিশিরকণিকায়; তারি সূক্ষ্ম উত্তরীতে
গেঁথেছিল শিল্পকারু প্রভাতের দোয়েলের গীতে
চকিত কাকলিসূত্রে; প্রিয়ার বিহ্বল স্পর্শখানি
সৃষ্টি করিয়াছে তার সর্বদেহে রোমাঞ্চিত বাণী,
নিত্য তাহা রয়েছে সঞ্চিত। যেথা তব কর্মশালা
সেথা বাতায়ন হতে কে জানি পরায়ে দিত মালা
আমার ললাট ঘেরি সহসা ক্ষণিক অবকাশে,
সে নহে ভৃত্যের পুরস্কার; কী ইঙ্গিতে কী আভাসে
মুহূর্তে জানায়ে চলে যেত অসীমের আত্মীয়তা
অধরা অদেখা দূত, বলে যেত ভাষাতীত কথা
অপ্রয়োজনের মানুষেরে।
সে মানুষ, হে ধরণী,
তোমার আশ্রয় ছেড়ে যাবে যবে, নিয়ো তুমি গণি
যা-কিছু দিয়েছ তারে, তোমার কর্মীর যত সাজ,
তোমার পথের যে পাথেয়, তাহে সে পাবে না লাজ;
রিক্ততায় দৈন্য নহে। তবু জেনো অবজ্ঞা করি নি
তোমার মাটির দান, আমি সে মাটির কাছে ঋণী–
জানায়েছি বারংবার, তাহারি বেড়ার প্রান্ত হতে
অমূর্তের পেয়েছি সন্ধান। যবে আলোতে আলোতে
লীন হত দড়যবনিকা, পুষ্পে পুষ্পে তৃণে তৃণে
রূপে রসে সেই ক্ষণে যে গূঢ় রহস্য দিনে দিনে
হত নিঃশ্বসিত, আজি মর্তের অপর তীরে বুঝি
চলিতে ফিরানু মুখ তাহারি চরম অর্থ খুঁজি।
যবে শান্ত নিরাসক্ত গিয়েছি তোমার নিমন্ত্রণে
তোমার অমরাবতী সুপ্রসন্ন সেই শুভক্ষণে
মুক্তদ্বার; বুভুক্ষুর লালসারে করে সে বঞ্চিত;
তাহার মাটির পাত্রে যে অমৃত রয়েছে সঞ্চিত
নহে তাহা দীন ভিক্ষু লালায়িত লোলুপের লাগি।
ইন্দ্রের ঐশ্বর্য নিয়ে হে ধরিত্রী, আছ তুমি জাগি
ত্যাগীরে প্রত্যাশা করি, নির্লোভেরে সঁপিতে সম্মান,
দুর্গমের পথিকেরে আতিথ্য করিতে তব দান
বৈরাগ্যের শুভ্র সিংহাসনে। ক্ষুব্ধযারা, লুব্ধ যারা,
মাংসগন্ধে মুগ্ধ যারা, একান্ত আত্মার দৃষ্টিহারা
শ্মশানের প্রান্তচর, আবর্জনাকুণ্ড তব ঘেরি
বীভৎস চীৎকারে তারা রাত্রিদিন করে ফেরাফেরি,
নির্লজ্জ হিংসায় করে হানাহানি।
শুনি তাই আজি
মানুষ-জন্তুর হুহুংকার দিকে দিকে উঠে বাজি।
তবু যেন হেসে যাই যেমন হেসেছি বারে বারে
পণ্ডিতের মূঢ়তায়, ধনীর দৈন্যের অত্যাচারে,
সজ্জিতের রূপের বিদ্রূপে। মানুষের দেবতারে
ব্যঙ্গ করে যে অপদেবতা বর্বর মুখবিকারে
তারে হাস্য হেনে যাব, বলে যাব, “এ প্রহসনের
মধ্য-অঙ্কে অকস্মাৎ হবে লোপ দুষ্ট স্বপনের;
নাট্যের কবররূপে বাকি শুধু রবে ভস্মরাশি
দগ্ধশেষ মশালের, আর অদৃষ্টের অট্টহাসি।’
বলে যাব, “দ্যূতচ্ছলে দানবের মূঢ় অপব্যয়
গ্রন্থিতে পারে না কভু ইতিবৃত্তে শাশ্বত অধ্যায়।’
বৃথা বাক্য থাক্‌। তব দেহলিতে শুনি ঘন্টা বাজে,
শেষপ্রহরের ঘন্টা; সেই সঙ্গে ক্লান্ত বক্ষোমাঝে
শুনি বিদায়ের দ্বার খুলিবার শব্দ সে অদূরে
ধ্বনিতেছে সূর্যাস্তের রঙে রাঙা পূরবীর সুরে।
জীবনের স্মৃতিদীপে আজিও দিতেছে যারা জ্যোতি
সেই ক’টি বাতি দিয়ে রচিব তোমার সন্ধ্যারতি
সপ্তর্ষির দৃষ্টির সম্মুখে; দিনান্তের শেষ পলে
রবে মোর মৌন বীণা মূর্ছিয়া তোমার পদতলে।
আর রবে পশ্চাতে আমার, নাগকেশরের চারা
ফুল যার ধরে নাই, আর রবে খেয়াতরীহারা
এ পারের ভালোবাসা– বিরহস্মৃতির অভিমানে
ক্লান্ত হয়ে রাত্রিশেষে ফিরিবে সে পশ্চাতের পানে।

তাই তাঁর জন্মদিনে পূন‍্যবতী এ বৈশাখের সন্ধিক্ষনে গেয়ে চলা-

হে নূতন,

           দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ ।।

           তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদঘাটন

                          সূর্যের মতন ।

           রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন ।

                    ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,

           ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময় ।

           উদয়দিগন্তে শঙ্খ বাজে,  মোর চিত্তমাঝে

                   চিরনূতনেরে দিল ডাক

                         পঁচিশে বৈশাখ ।। 

এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।

তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

 বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥

যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,

 অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥

 মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,

 অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।

রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,

 আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।

 মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক॥