চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমি কর্মকর্তা জিল্লুর রহমানের খুঁটির জোর কোথায়? একই পদে ১৫ বছর

এম. মতিন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি। 
তিনি ১৫ বছর ধরেই আছেন চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে। মালিক হয়েছেন অঢেল সম্পত্তির। দাপট আর প্রভাবে বন্দর ভুমি শাখা যেন তার কাছে বন্দি।কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করেন না তিনি। বলছিলাম চট্টগ্রাম বন্দরের ভুমি শাখার ব্যবস্থাপক জিল্লুর রহমানের কথা।
চট্টগ্রাম বন্দরের এস্টেট শাখা পরিণত হয়েছে দূর্নীতির স্বর্গরাজ্যে, অবৈধ ভাবে কালুরঘাট কর্ণফুলী নদী তীর ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে বিপত্তিতে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) জিল্লুর রহমান সেলিম। জরুরি ভিত্তিতে তা বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছে বন্দরের হাইড্রোগ্রাফী শাখা। এ নিয়ে দুই সংস্থার মধ্যে চলছে রশি টানাটানি।
সম্প্রতি কর্ণফুলী নদীর বেপরোয়া অবৈধ দখলকারীদের উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের এই নির্দেশনা মেনে নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান চলমান রয়েছে। 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে এ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের সাপ্রতিক এক অনুষ্ঠানে নদীর তীর ইজারা না দেওয়ার জন্য নির্দেশনাও দিয়েছিলেন নৌ পরিবহন মন্ত্রী। মন্ত্রীর ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে গত ৭ জানুয়ারী বন্দরের ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) মোঃ জিল্লুর রহমান নদীর কালুরঘাট সেতুর এলাকার তিন মাসের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে বালু আনলোডিং এর অনুমতি দিয়েছেন। চার শর্তে ভলগেট থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছেন তিনি। শর্তের মধ্যে রয়েছে, নদীর ব্যাংক লাইন থেকে ৫০ মিটারের মধ্যে বালুর স্তুপ করা যাবে না। নদীর তীর ভরাট করা যাবে না। এছাড়াও রয়েছে, আনলোডিং এর কারণে নদীর তীর ক্ষতিগ্রস্থ হলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
বন্দর সুত্রে জানা যায়, বন্দরের বালু মহাল মেসার্স হোমল্যান্ড বিল্ডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে আইন বহির্ভূত (ইজারা) নদীর তীর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট)। এই নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বন্দরের ইজারাপ্রাপ্ত বালু মহালের ইজারাদাররা। বন্দরের ইজারাপ্রাপ্ত বালু মহালের ইজারাদাররা জানান, অবৈধ সুবিধার আদায়ের মাধ্যমে ডেপুটি ম্যানেজার নিয়ম বহির্ভূতভাবে বালু আনলোডিং এর অনুমতি দিয়েছেন। বন্দরের ইজারাদার ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে বন্দর এলাকায় আনলোডিং এর অনুমতি দেওয়া বন্দর আইনের পরিপন্থী।
সরেজমিন দেখা যায়, কালুরঘাট সেতু এলাকায় এ কে খান ডকইয়ার্ডে অবৈধভাবে কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠেছে এই ডাম্পিং পয়েন্টটি। একইভাবে বন্দর থেকে তিন মাসের অনুমতি নিয়ে পরোক্ষভাবে নদীর তীর দখলের পথ সুগম করা হয়েছে বলে দাবি পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতাদের। 
এই ব্যাপারে “দূষণ হঠাও, পরিবেশ বাঁচাও, কর্ণফুলী বাঁচাও” আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক মুহাম্মদ মফিজুল ইসলাম জানান, রক্ষকেরা এখন ভক্ষকের ভূমিকা পালন করার কারণে কর্ণফুলী নদীর তীর যার যেমন ইচ্ছে, তেমন করে নদীর তীর গিলে খাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী কালুরঘাট সেতু এলাকা থেকে কথিত হোমল্যান্ড বিল্ডার্সকে অপসারণের জন্য আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বন্দর ও এ কে খান ডকইয়ার্ডকে কয়েক দফা চিঠি দিলেও সুফল মেলেনি। অতিসত্তর অবৈধ আনলোডিং ড্রেজার ও এ কে খান এন্ড কোম্পানি লিমিটেড এর ডাম্পিং পয়েন্টটি বন্ধ করা না হলে বন্দরের চেয়ারম্যান ও জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের চীফ হাইড্রোগ্রাফার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু থেকে কালুরঘাট সেতু এলাকা হাইড্রোগ্রাফীক সার্ভে অনুযায়ী বালুর ইজারা প্রদান করে বন্দর। শুধুমাত্র বন্দর কর্তৃক অনুমোদিত ইজারাদার প্রতিষ্ঠানই ড্রেজিং করতে পারবে। কালুরঘাট সেতু এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠান আনলোড ড্রেজার অবৈধভাবে স্থাপন করা হয়েছে। এতে ড্রেজিং কাজে শৃঙ্খলা বিনষ্ট হচ্ছে। তাই আনলোড ড্রেজার দ্রুত অপসারণ করা প্রয়োজন। অবৈধ আনলোড ড্রেজার অপসারণের জন্য একই প্রতিষ্ঠানের অথরাইজড অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন চীফ হাইড্রোগ্রাফার।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ১/১১ সরকারের সময় দুর্নীতির দায়ে পৌনে এক বছর জেল খাটার পর মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে তার সকল অনিয়ম ধামাচাপা দিয়ে বন্দরের ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) হিসেবে যোগদেন জিল্লুর রহমান। দীর্ঘ পনের বছর যাবৎ একই পদে থেকে বন্দরের এস্টেট শাখায় নয়ছয় করে শতকোটি টাকার অবধৈ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এফএমসি ডকইয়ার্ডেও রয়েছে ৫০% মালিকানা। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে টুরিষ্ট জাহাজ।
বন্দরের এস্টেট শাখার এক কর্মচারী জানান ২০০৪ সালে জিল্লুর রহমানের বাসার কাজের মেয়েকে ধর্ষনের পর হত্যার অভিযোগ উঠলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তা ধামা চাপা দেওয়া হয়েছে। বন্দরের এস্টেট শাখার বর্তমানে বহিস্কৃত অফিস সহকারী মমতাজ বেগম ও ইশরাত জাহান চৌধুরীর সাথে তার অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে চলছে নানা সমালোচনা।চট্টগ্রাম নগরীর বন্দরটিলায় ছাত্রলীগনেতা মহিউদ্দিন হত্যা কান্ডের প্রধান আসামী হাজী ইলিয়াছকে মাধ্যমে হিসেবে ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের এস্টেট শাখাকে দূর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে (ফোনে) জানতে চাইলে বন্দরের ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) মোঃ জিল্লুর রহমান বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের অধীনে বালুমহাল-১ থেকে বালু উত্তোলনের ইজারা পেয়েছে ‘ওই প্রতিষ্ঠান’। এতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে। নদী থেকে উত্তোলিত বালু ভলগেট থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে আনলোডিং এর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে সমস্যা দেখা দিলে চুক্তি আর নবায়ন করা হবে না।’
 তিনি আরও বলেন, ‘বন্দরের বালু সংক্রান্ত বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব হাইড্রোগ্রাফার শাখার। কিন্তু আনলোডিং এর অনুমতি দিয়েছে এস্টেট শাখা।’ দুর্নীতির দায়ে পৌণে এক বছর জেল খাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নেটওয়ার্ক সমস্যা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
প্রসঙ্গত, হত্যা, দুর্নীতিসহ অসংখ্য অভিযোগে অভিযুক্ত জিল্লুর রহমান একই পদে দীর্ঘ ১৫ বছর কর্মরত থেকেও  অদৃশ্য কোন এক কালো হাতের ইশারায় তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন তার এসব নিয়মনীতিহীন কর্মকান্ড।